গতকাল মুক্তি পেয়েছে বাংলাদেশে নির্মিত প্রথম হরর মুভি ডাইনি বুড়ি। প্রথম দিনেই আশানুরূপ সাড়া পেয়েছে মুভিটি। দর্শকরাও আগ্রহ নিয়ে দেখেছেন মুভিটি। মুভিটি পরিচালনা করেছেন এ কে সোহেল। তিনি একাধারে প্রযোজক, পরিচালক ও কাহিনীকার। সম্প্রতি তিনি এসেছিলেন যায়যায়দিনের চে কাফেতে।
মুভিতে আগমন সম্পর্কে বলুন।
ছোটবেলা থেকেই মুভিভক্ত ছিলাম। লেখাপড়া চলাকালে বার্ষিক পরীক্ষার পর বই-খাতা বিক্রি করে ট্রেনের ছাদের ওপর যাতায়াত করে সিনেমা হলে গিয়ে মুভি দেখতাম। মুভি দেখতে দেখতে এক সময় ইচ্ছা জাগলো মুভিতে অভিনয় করবো। অনেক কষ্ট করে চিত্র পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর ঠিকানা সংগ্রহ করে তার সঙ্গে দেখা করলাম। তাকে দেখে মনে হলো, অভিনেতার চেয়ে পরিচালকের সম্মান অনেক বেশি। তাই মনস্থির করলাম পরিচালক হবো। দেলোয়ার জাহান ঝন্টু তার ভাই রিটায়ার্ড ক্যাপ্টেন সারোয়ার জাহান সেন্টুর সঙ্গে ১৯৮৯ সালে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি পঙ্গু ছিলেন, লিখতে পারতেন না। চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও চলচ্চিত্র সম্পর্কে তিনি জানতেন ও বুঝতেন। প্রথমে তিনি প্রতিদিন ১ ঘণ্টা করে আমাকে দিয়ে মুভির কাহিনী লিখতেন। এর বিনিময়ে ১০ টাকা করে দিতেন। পরে টিভিতে মুভি দেখিয়ে ক্যামেরার বিভিন্ন শট বোঝাতেন। এতে করে চিত্রনাট্য ও কাহিনী লেখার বিষয়টা আয়ত্ত করতে পেরেছিলাম। পরিচয় হওয়ার ৭ মাসের মাথায় তিনি মারা যান। এরপর চলচ্চিত্র থেকে পাচ বছর বিরত ছিলাম। এক পর্যায়ে দেখি আমার সঙ্গে যারা চলচ্চিত্রে একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেছিল তারা অনেকেই প্রযোজক ও পরিচালক হয়েছেন। এ বিষয়টি ভাবতেই মনে আবার চলচ্চিত্রের ওপর আশার আলো জাগে। ১৯৯৪ সালে গাজী জাহাঙ্গীর পরিচালিত শেষ সংগ্রাম মুভির অ্যাসিস্টান্ট হওয়ার সুযোগ পাই। পরে তার পাচটি মুভিতে প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করি। কিছুদিন যাওয়ার পর চিত্র পরিচালক মোস্তফা আনোয়ার, এস আলম সাকী, বজলুর রাসেদ চৌধুরী, আহমেদ নাসিরের সঙ্গে কাজ করি। এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম নিজের অভিজ্ঞতায় মুভি নির্মাণ করার। আমি বেশির ভাগ অ্যাকশন মুভিতে অ্যাসিস্টান্ট হিসেবে কাজ করেছি। তাই এই গণ্ডি পার হয়ে ভিন্ন ধারার মুভি নির্মাণের আশা জাগলো। তাই এফডিসির চার দেয়াল থেকে বের হয়ে গ্রামে চলে গেলাম। বন্ধু-বান্ধব ও সাধারণ দর্শকের মতামত নিয়ে জামালপুর খায়রুন বিবির সত্য ঘটনা অবলম্বনে খায়রুন সুন্দরী মুভিটি নির্মাণ করি। ২০০৪ সালে মুভিটি মুক্তি পাওয়ার পর দর্শকদের ব্যাপক সাড়া পেলাম। এ মুভির জন্য সাংবাদিক সংগঠন বাবিসাস, জাতীয় যুব সাংস্কৃতিক সংস্থা (যুসাস), সাংস্কৃতিক সংগঠন বিনোদন মেলা ও জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার দর্শকরা আমাকে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে অ্যাওয়ার্ড দিয়েছিল। এভাবেই চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে।
গতকাল মুক্তি পেয়েছে আপনার নির্মিত ডাইনি বুড়ি মুভিটি। এ মুভিটি সম্পর্কে বলুন।
এক সময় দেশের অনেক খ্যাতিমান চিত্র পরিচালকরা হরর মুভি নির্মাণের জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন। উদ্যোগ নেয়ার পরও বিশেষ কিছু কারণে হরর মুভি নির্মাণে তারা পিছপা হন। কারণ এটি ভিন্ন ট্র্যাকের মুভি। নির্মাণের পরও অনেক বাধা থাকে। হরর মুভি নির্মাণের পর দর্শকরা মুভিটি ভালোভাবে গ্রহণ করবে কিনা এটিও ভাবার বিষয় রয়েছে। তারপর নির্মাতাদের ভয় থাকে সেন্সর নিয়ে। সেন্সর অতিরিক্ত ভয়ঙ্কর দৃশ্যাবলী কর্তন করে অথবা সেন্সর সনদপত্র নাও দিতে পারে। এ কারণে কোনো নির্মাতা হরর মুভি নির্মাণে সাহস করেননি। ডাইনি বুড়ি মুভিটি নির্মাণের আগে অনেকে বাধা দিয়েছিল কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে সাহস করে মুভিটি নির্মাণ করেছি। লোকসান যাতে না হয় সেজন্য কমার্শিয়ালি মুভিটি নির্মাণ করেছি।
নতুন শিল্পীদের নিয়ে মুভিটি নির্মাণের কারণ কি?
এটি ব্যতিক্রমধর্মী মুভি। যে কারণে মুভিতে কোনো নায়ক বা নায়িকা থাকবে না। পাচটি মেয়ে থাকবে। তাদের ভূত বানাবো, এরাই গল্প এগিয়ে নিয়ে যাবে। নতুন নায়িকা নেয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন বর্তমান সময়ের সুপারস্টার শাবনূর, মৌসুমী, পূর্ণিমা, পপি এদের দিয়ে মুভিটি নির্মাণ করতে পারতাম। কিন্তু দর্শকরা এদের সবসময় রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে দেখে এসেছে। হঠাৎ করে তাদের বিকৃতি, বড় দাত লাগানো চেহারা পর্দার সামনে এলে দর্শকরা এ বিষয়টিকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে না-ও পারে। ভূত হচ্ছে অজানা ও অচেনা একটি জিনিস তাই আমি নতুন মুখ নিয়ে মুভিটি নির্মাণ করেছি।
মুভিটি নির্মাণ করতে গিয়ে কোনো সমস্যায় পড়েছিলেন কি?
এ দেশে ভৌতিক অ্যানিমেশনের জন্য কোনো তথ্য প্রযুক্তি এখনো পরিপূর্ণভাবে চালু হয়নি। তাছাড়া দক্ষ অপারেটর যন্ত্রাংশ ক্যামেরা নেই। আর আমি এ বিষয়টিতে একেবারেই অজ্ঞ ছিলাম। এর আগে কোথাও প্রশিক্ষণ বা এ ধরনের কোনো মুভিতে অ্যাসিস্টান্ট হিসেবে কাজ করিনি। যার কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুভিটি পরিপূর্ণভাবে করতে পারিনি।
এ পর্যন্ত কয়টি মুভি নির্মাণ করেছেন?
এ পর্যন্ত ছয়টি মুভি নির্মাণ করেছি। এর মধ্যে প্রযোজনা ও পরিচালনায় মুক্তিপ্রাপ্ত মুভির মধ্যে খায়রুন সুন্দরী, বন্ধক ও ডাইনি বুড়ি রয়েছে। শুধু পরিচালনায় মুক্তি পেয়েছে জমেলা সুন্দরী, বাংলার বউ ও প্রাণের স্বামী (কলকাতা) মুভি। শিগগির আরো দুটি মুভির কাজ ধরার ইচ্ছা রয়েছে। একটি লজিং মাস্টার ও আরেকটি এক টাকার দেনমোহর মুভি।
মুভির বাইরে আর নতুন কিছু ভাবছেন কি?
চলচ্চিত্রকে নিয়েই তো সারা জীবন ছিলাম। কিন্তু এ গণ্ডি পার হয়ে ছোট পর্দার অভিজ্ঞতা নেয়ার খুব ইচ্ছা রয়েছে। শিগগিরই ১০০ পর্বের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে কমেডি মেগা সিরিজ নির্মাণ করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। নাটকটির স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ হয়েছে।
মুভি নিয়ে আপনার আগামীর ভাবনা কি?
যতো দিন বাচবো চলচ্চিত্রকেই আকড়ে ধরে রাখবো। মুভি নির্মাণ হচ্ছে আমার নেশা ও পেশা। মুভি নির্মাণ করতেই হবে। আর নির্মাণ করতে না পারলে পাগল হয়ে যাবো। আমার ইচ্ছা আছে বিগ বাজেটে মুরু মুভির চিত্রায়ণে একটি মুভি নির্মাণ করার। এটি হতে পারে পাকিস্তানের লাহোরে অথবা ইনডিয়ার রাজস্থানে। ইতিমধ্যে মুভির কাহিনীর লেখার কাজও শেষ করেছি।
সূত্রঃ যায়যায়দিন।
No tag for this post.