নায়ক মান্নাকে অশ্রুসজল বিদায় জানাল জনসমুদ্র
সকাল থেকেই এফডিসির সামনের রাস্তা পরিণত হয় বিশাল জনসমুদ্রে। সবাই এসেছে প্রিয় নায়কের মুখটি শেষবার দেখার জন্য। বেশ কয়েক বছর আগে চিত্রনায়ক জাফর ইকবাল এবং পরে সালমান শাহর মৃত্যুতে নেমেছিল শোকাহত মানুষের এমন ঢল।
গতকাল সোমবার মানুষের এমনই ঢল নেমেছিল যে, টিয়ার গ্যাস সেল নিক্ষেপ এবং জল কামান দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। শোকাহত মানুষের দাবি একটাই, শেষবারের মতো দেখতে দিতে হবে মান্নার মুখ।
সকাল সাড়ে ১০টায় জনসমুদ্রের মধ্যে একটা অ্যাম্বুলেন্স এফডিসিতে নিয়ে আসে মান্নার নিথর দেহ। তাঁর নায়ক হয়ে গড়ে ওঠার, নায়ক হিসেবে কাজ করার পাদপীঠ এ প্রতিষ্ঠানে তখন অন্য রকম চিত্র। বুকে বেদনা আর চোখে অশ্রুধারায় সিক্ত হলো অনেকেই। এদের কেউ মান্নার স্বজন বা শ্রদ্ধেয়জন, কেউ সহকর্মী, কেউবা তাঁর ভক্ত। সবাইকে কাঁদিয়েই যেন হঠাৎ চলে গেলেন জনতার নায়ক মান্না।
এমন মৃত্যু কজনের হয়? শত বা হাজার নয়, লাখ লাখ মানুষ কেঁদেছে, দীর্ঘ সময় অধীর আগ্রহে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল মান্নার মুখ দেখার জন্য। শুধু এফডিসিতে নয়, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও নেমেছিল মানুষের ঢল। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দুই পাশে অশ্রুসজল মানুষ হাত নেড়ে বিদায় জানিয়েছে মান্নাকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি।
এফডিসিতে মান্নার মরদেহ নিয়ে আসার কিছুক্ষণ পরই মান্নার ছেলে ১৪ বছরের সিয়াম ইলতিমাস বলল, “আমার আব্বুকে কেউ বকা দেবেন না। যাঁরা আব্বুকে টাকা দিয়েছিলেন, যাঁদের ছবির কাজ আব্বু শুরু করতে পারেননি, তাঁদের সব টাকা আমরা দিয়ে দেব। তবুও দয়া করে আব্বুকে কেউ বকা দেবেন না। আমার আব্বুকে আপনারা ক্ষমা করে দেবেন। আমার আব্বু···আমার আব্বু···।” আর কথা বলতে পারেনি সিয়াম, দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।
এফডিসিতে মান্নার মরদেহ নিয়ে আসার কিছু পরই সোনারগাঁও হোটেল থেকে টঙ্গী ডাইভারশন রোড, মগবাজার, সাতরাস্তা, নাবিস্কো-মহাখালী পর্যন্ত শোকাহত ভক্তদের ভিড় লেগে যায়। এরই মধ্যে চলচ্চিত্র তারকারা মানুষের ভিড় ঠেলে এফডিসিতে আসছিলেন শেষবারের মতো প্রিয় সহকর্মীকে শ্রদ্ধা জানাতে। অনেক তারকাই রাস্তা থেকে ফিরে গেছেন। মান্নার দীর্ঘদিনের সহকর্মী মৌসুমী তিন দফা চেষ্টা করেও মানুষের ভিড় সামলে এফডিসিতে পৌঁছাতে না পেরে টেলিফোনে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “মান্নাকে শেষবার দেখতে পারলাম না।”
এফডিসির বাইরে যখন এমন দৃশ্য এফডিসির ভেতরে তখন গভীর শোকাবহ পরিবেশ। শিল্পী ও কলাকুশলীদের কান্না দেখে র্যাব ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
এ টি এম শামসুজ্জামান, রাজ্জাক, আলমগীর, ফারুক, ববিতা, সুচন্দা, চম্পা, কবরী, সোহেল রানা, পপি, শাবনূর, শিমলা, শাকিব খানসহ আরও অনেককেই কাঁদতে দেখা গেছে। বেলা ১১টায় প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এফডিসিতে। একই জায়গায় ৩০ মিনিট পরে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ নিয়ে র্যাব ও পুলিশের সহযোগিতায় শহীদ মিনারের উদ্দেশে রওনা হয় অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু এফডিসির প্রধান ফটকে পায় বাধা। বাইরে অপেক্ষমাণ জনতার দাবি, তারা প্রিয় নায়ককে এক নজর দেখবে। শোকার্ত জনতাকে সবাই বোঝাল, “এটা সম্ভব নয়, শহীদ মিনারে যাবে মরদেহ, তারপর টাঙ্গাইল।” সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। জনতা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। বাধ্য হয়ে পুলিশ টিয়ার গ্যাস শেল নিক্ষেপ করে। র্যাব চেষ্টা করে জনতাকে নিবৃত্ত করতে, তবুও শান্ত হয় না পরিস্থিতি। প্রায় তিন ঘণ্টা এ অবস্থা চলার পর দাঙ্গাপুলিশ নিয়ে আসা হয়। তার পরও প্রবল বাধা আসে। সবার দাবি, মান্নাকে দেখতে দিতে হবে। এ সময় ভক্তরা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে। বাধ্য হয়ে অ্যাম্বুলেন্স এফডিসির ভেতর নিয়ে রাখা হয়। এ সময় খবর আসে শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নেমেছে। সেখানে মরদেহ নিয়ে যেতে হবে, তা না হলে সেখানেও জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে। এ সময় এফডিসির ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হেলিকপ্টার চেয়ে সাহায্য চান। কিন্তু হেলিকপ্টার নামার কোনো জায়গা নেই এফডিসিতে, তাই ওই পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়।
এফডিসির পুরোনো ফটক দিয়ে মরদেহ বের করার পরিকল্পনা হলে দেখা যায়, সাতরাস্তা থেকে মহাখালী পর্যন্ত মানুষ রাস্তা দখল করে রেখেছে। নিরুপায় হয়ে শহীদ মিনারে মান্নার মরদেহ নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। দুপুর তখন প্রায় দুইটা। মান্নার পরিবারের লোকজন প্রশাসনকে দ্রুত একটা কিছু করার জন্য আবেদন জানায়। ডাকা হয় আরও দাঙ্গাপুলিশ। তারা বেধড়ক লাঠিচার্জ করে সোনারগাঁও থেকে এফডিসি পর্যন্ত রাস্তা পুরোটাই খালি করে। তারপর মান্নার মরদেহ নিয়ে টাঙ্গাইলের উদ্দেশে রওনা হয় তাঁর পরিবারের লোকজন।
মান্নার মরদেহ নিয়ে যাওয়ার পর এফডিসির বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে। প্রতিটি তলায় সহকর্মীরা আহাজারি করতে থাকেন। নায়িকা শিমলা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “এই ফ্লোরে মান্না ভাই আর কোনো দিন আসবেন না, কথা বলবেন না, মারামারি করবেন না, সাজঘরে বসে আড্ডা দেবেন না।”
এর আগে গত রোববার গভীর রাতে মান্নার স্ত্রী শেলী কাদের দুবাই থেকে দেশে ফিরে হাসপাতালে ছুটে যান। বিমানবন্দরে আসার পরই তাঁকে জানানো হয় স্বামীর মৃত্যুর খবর। শেলী হাসপাতালে গিয়ে মান্নার মরদেহ উত্তরায় নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। সেখান থেকে মরদেহ সাড়ে ১০টায় এফডিসিতে নিয়ে আসা হয়।
গত রোববার বেলা ১১টায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এস এম আসলাম তালুকদার মান্না মাত্র ৪৪ বছর বয়সে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে মারা যান।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব জামিল ওসমান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে মান্নার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
সূত্রঃ প্রথম আলো।
Bangla Video Tags: Manna, মান্না
Evergreen Bangla Video 
i can’t read anything