ছোট পর্দার দুই সফল নাট্যকার সেলিম-ফারুক
ভালো নাট্যকার হিসেবে দর্শকদের কাছে পরিচিত হওয়াটা সময়ের ব্যাপার হলেও ছোট পর্দার নাটক লিখে এরই মধ্যে বেশ আলোচিত হয়েছেন মাহমুদুল ইসলাম সেলিম ও ফারুক হোসেন। একজন মঞ্চে কাজ করতে করতে নাট্যকার, অন্যজন ছোট থেকেই লেখালেখি করে। আড্ডার কথোপকথনে উঠে এসেছে তাদের ভাবনা, বর্তমান কাজ ও ভবিষ্যৎ।
নাটক নিয়ে চিন্তা-ভাবনা কিভাবে শুরু হলো?
ফারুক : আমি ছোট থেকেই লেখালেখি করতাম। কিন্তু আমার বন্ধুরা জানতো না। মা আমাকে খুব উৎসাহ দিতেন লেখার ব্যাপারে। এভাবেই লেখালেখির মধ্যে জড়িয়ে যাই। আমি অনেক দিন পত্রিকাতেও লেখালেখি করেছি। আমার লেখা যে সবাই পড়বে এমনটি আমি ভাবিনি, লিখতে ভালো লাগে তাই লিখি। এভাবেই নাটক লেখায় চলে এলাম।
সেলিম : আমি কোনো প্রস্তুতি নিয়ে নাটক লিখতে আসিনি। আমি মঞ্চে অভিনয় করি ১৯৯০ সাল থেকে। মঞ্চের প্রয়োজনে আমি নাটক লেখা শুরু করি। এ ক্ষেত্রে আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন ড. এনামুল হক ও লাকী ইনাম। মঞ্চের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমি নাটক লিখি এবং পত্রিকায় মঞ্চ নাটকের সমালোচনা লিখতাম। এটাও অনেক কাজে লেগেছে নাটক লেখার ব্যাপারে। আমার মা কোনো কাজে আমাকে নিরুৎসাহিত করতেন না। আর আমার স্ত্রী ডা. লাভলী আমাকে খুব বেশি উৎসাহিত করতো। এভাবেই নাটক লেখায় আসা।
কেউ ঘটনা নিয়ে লেখে আবার কেউ চরিত্র নিয়ে লেখে, আপনাদের ক্ষেত্রে কোনটা হয়?
ফারুক : আমার কাছে এ ব্যাপারটা তেমন গুরুত্ব পায় না। আমি চিন্তা করি আমার লেখা কি ডিমান্ড করছে। যদি চরিত্র প্রাধান্য পায় তাহলে চরিত্র নিয়ে সামনে যাই আর যদি ঘটনা প্রাধান্য পায় তাহলে ঘটনায় চলে আসি। যদিও বিখ্যাত সব মুভি ও লেখা চরিত্র নির্ভর। আমি কিছুদিন আগে একটা লেখা পড়ে অবাক হই। যারা নতুন লেখা শুরু করে তারা ঘটনা নির্ভর বেশি হয় ও তাদের ব্রেনের ডান সাইডটা বেশি কাজ করে এবং চরিত্র নির্ভর লেখা লিখলে তাদের ব্রেনের বাম সাইডটা বেশি কাজ করে। আমার কাছে মাস্টার তিনি, যিনি ঘটনা ও চরিত্র দুটো নিয়েই কাজ করতে পারেন।
সেলিম : আমার ব্যাপারে ঘটে- আমার পছন্দের একটা বিষয় থাকে। সেটা নিয়েই আমি লেখা শুরু করি। আমার কাছে মনে হয় একটা ভালো ফল পেতে হলে অবশ্যই একটা ভালো বীজ রোপণ করতে হবে। মানুষ ভালো কাজ করলে ভালো ফল পায় আর খারাপ কাজ করলে অবশ্যই খারাপ ফল পাবে। যখন আমি মঞ্চে কাজ করি সেখানে আমাকে ছোট চরিত্রগুলো ধরে এগোতে হয়। চরিত্রগুলো যদি ফুটিয়ে না তুলতে পারি তাহলে আমি যতো ভালো ঘটনা নিয়েই লিখি না কেন, তা সফল হবে বলে মনে হয় না। আর টিভি মিডিয়ায় যে কোনো মাধ্যমে কাজ করা যায় বলে মনে হয়। এটা আমার সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।
আপনাদের দুজনের বয়সের দূরত্বটা একটু বেশি, লেখালেখি শুরু করেছেন দুজনই। এ বয়সের দূরত্বটাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন।
ফারুক : আমি মনে করি সেলিম ভাইয়ের জেনারেশনটা একটা বড় সময় অন্ধকারের মধ্যে ছিল। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এভাবে ভাগ হয়ে যায় ১৯৭৫ সালের পর থেকেই এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এ জেনারেশনটা কাজ করছে মিডিয়ায়। বর্তমানে যারা নতুন এবং মিডিয়ায় কাজ করছি তারা অনেক বেশি খোলামেলা মনের। আমরা বাবা-মায়ের সঙ্গে সব কিছু শেয়ার করি। অনেক ফ্রি কথা বলতে পারি। আমাদের বাবা-মায়েরা আমাদের সঙ্গে যতোটা ফ্রি তার চেয়ে অনেক বেশি ফ্রি ভাবে চলে আমাদের বড় ভাইয়েরা যারা বিয়ে করেছে, সন্তান হয়েছে। আগে স্কুলের টিচাররা ছাত্রদের মারতে মারতে অনেক সময় মেরেই ফেলেছেন কিন্তু এখন শিক্ষকরা ছাত্রদের গায়ে হাত দেন না। এ রকম অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
সেলিম : আমি আসলে এখানে জেনারেশন গ্যাপটা ওইভাবে বলবো না। কারণ আমি নিজেকে বৃদ্ধ রাইটার হিসেবে স্বীকার করি না। ফারুক যখন থেকে লিখছে আমিও তখন থেকে লিখছি। হয়তো ও ঠিক সময়ে লিখেছে এবং আমি একটু দেরিতে লিখেছি। আরেকটা কথা বলবো, বর্তমানে ছেলেমেয়েদের মধ্যে পরিবর্তনটা খুব বেশি। তারা সব সময় ভাবে সে-ই সঠিক। পরিবর্তনটা আনা উচিত, কিন্তু অতীতকে বাদ দিয়ে নয়। আমি যদি অতীতকে না স্বীকার করি তাহলে হয়তো কাল আমাকে নতুনরা স্বীকার করবে না। আর মিডিয়া হচ্ছে এমন জায়গা যেখানে নিজের স্থান তৈরি করে নিতে হয়। এখানে কেউ কারো জন্য কিছু করে না। আর আমি মনে করি জেনারেশন গ্যাপটা না বলে আমাদের উচিত জেনারেশন ব্রিজ তৈরি করা। তাহলে আমরা আরো অনেক বেশি শিখতে পারবো, জানতে পারবো।
নাটক লেখা পেশা হিসেবে কতোটুকু গ্রহণযোগ্য?
সেলিম : শিল্পের কাজ ও পেশা আমার কাছে মনে হয় দুটোই ভিন্ন জিনিস। শিল্পের সঙ্গে পেশার কোনো সম্পর্ক নেই। শিল্পকে যদি পেশা হিসেবে নেয়া হয় তাহলে তার মানটা কিছুটা হলেও কমে যায়। নাটক লেখা পেশা হিসেবে নেয়া যাবে না, এটা আমি বলবো না। যদি কেউ নাটককে পেশা হিসেবে নিতে চায় তাহলে আরো বেশি পরিশ্রম করতে হবে এবং অনেক বেশি প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ফারুক লেখালেখি করে অনেকটা সফলতা পাচ্ছে তাই আমাকেও লেখালেখি করতে হবে- এ রকম নয়। সেজন্য অবশ্যই পূর্ব প্রস্তুতি থাকতে হবে।
ফারুক : যেহেতু আমাদের টিভি মিডিয়া ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে তাই অবশ্যই নাটক লেখা পেশা হিসেবে গ্রহণ করা যায় বলে আমি মনে করি। তবে তার জন্য তাকে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে, তার লেখা পাঠক যা টিভি দর্শকরা ভালোভাবে গ্রহণ করছে। যারা এ মাধ্যমে আসতে চায় তাদের স্বাগতম জানাই। যেহেতু আমাদের পরিসর আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে যেখানে একটি চ্যানেলে দিনে দুটি নাটক দেখাতো সেখানে বর্তমানে হয়তো পাচটি নাটক দেখাচ্ছে। চ্যানেলের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই অবশ্যই নাটক লেখা পেশা হিসেবে গ্রহণ করা যায়। তবে যোগ্যতাটা অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে।
কাদের লেখা পড়ে অনুপ্রেরণা পান।
সেলিম : আমি জানি না আমি কতোটা বুঝতে পারি, তবে রবীন্দ্রনাথের লেখা আমার খুব ভালো লাগে। আর নাট্যকার হিসেবে সেলিম আল দীনকে আমার লেখার প্রধান পার্ট হিসেবে জানি। আমাদের দুর্ভাগ্য, এ মানুষটা খুব অসময়েই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তার লেখা আমাকে খুব টানে। তার নাটকের জনপ্রিয়তায় আমি ঈর্ষা করি। আমার পছন্দের নাট্যকার মাসুম রেজা। এছাড়া ভিন্ন চিন্তাধারার জন্য ফারুককেও আমার ভালো লাগে।
ফারুক : আসলে আমি তেমন কাউকে নিয়ে ভাবতাম না। এ মুহূর্তে আন্তন চেকভ আমার প্রিয় লেখক। তিনি একজন রাশিয়ান। এভাবে বিদেশি কিছু কিছু লেখক আমার খুব প্রিয়। আমাদের দেশের সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, আবদুল মান্নান সৈয়দ অনেক বিশাল মাপের কবি। বাংলা লেখকের মধ্যে আমার প্রিয় হুমায়ুন আজাদ।
বর্তমান ব্যস্ততা কি নিয়ে?
ফারুক : বর্তমানে ন্যাশনাল অ্যাড অ্যান্ড টেলিফিল্মের ব্যানারে তাহের শিপনের পরিচালনায় নির্মিত হচ্ছে ধারাবাহিক নাটক সুফি। এছাড়া প্রক্রিয়াধীন আছে নাটক ঢাকা মেট্র ক ৮০৮০৮১ এবং কাজ করছি নতুন জীবন নামের ধারাবাহিকে। এছাড়া কাজ করেছি যে জীবন হয়নি যাপন, হাতে মাত্র ১৫ মিনিট ১৭ সেকেন্ড, রাবেয়া খাতুনের রাইমা গল্প অবলম্বনে চল স্বপ্ন ঘুড়ি, অদিতির অর্ধেক স্বপ্ন প্রভৃতি।
সেলিম : আমি যেহেতু মঞ্চের মানুষ তাই মঞ্চ থেকেই শুরু করি। মঞ্চে চলছে আমার নাট্যরূপে প্রাগৈতিহাসিক। মঞ্চে আমার মোট তিনটি কাজ হয়েছে। বাকিগুলো ছোট পর্দায়। আমার প্রথম নাটক মাহেন্দ্র ক্ষণ, এটা ’৯০ বা ৯১-এর দিকে লিখেছিলাম। এছাড়া সিরিয়াল পান্থ হে, আমি রবীন্দ্রনাথের গল্পের দুটি নাট্যরূপ দিয়েছি তা হলো মনিহারা ও মহামায়া। এ দুটো নাটক আমার খুব পছন্দের। এছাড়া সালাউদ্দিন লাভলুর ডিরেকশনে প্রচার হলো অ-যোগ বৃত্ত। সাইদুল আনাম টুটুলের ডিরেকশনে স্বপ্নলোকের চাবি। তাহের শিপনের পরিচালনায় ধূসর দিগন্ত, লাকী ইনামের নির্দেশনায় মেঘ রোদ্দুর খেলা মেগা ধারাবাহিকের শুটিং চলছে। এছাড়া কাজ করছি ওরা সমুদ্রে যাবে বলে ও আধা স্বপ্ন আধা বাস্তব। আরো লিখেছি ঝরা পাতার শব্দ, এই সময়ের গল্প, পৌনঃপুনিক জীবন।
লেখা নিয়ে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
সেলিম : আমি খুব ভালো কিছু কাজ অবশ্যই করতে চাই। একজন বড় মাপের নাট্যকার হতে চাই। চলচ্চিত্র বড় একটা জায়গা, সেখানে এখনো যাওয়ার পরিকল্পনা করছি না। তবে খুব ইচ্ছা হয় ঔপন্যাসিক হওয়ার। ছোট পর্দায় কাজ করে যাবো। অনেক সময় মনে হয় আমি যদি ডিরেকশনে আসি তবে নিজের ভাবনাটাকে নিজের মতো করে ফুটিয়ে তুলতে পারতাম।
ফারুক : নাটক যতোদিন ভালো লাগবে লিখে যাবো। তবে আমি কবিতা লিখতে খুব আনন্দ পাই। ভবিষ্যতে ইচ্ছা আছে কবিতার বই বের করার এবং সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।
সূত্রঃ যায়যায়দিন।
Bangla Video Tags: এনামুল হক, লাকী ইনাম।
Evergreen Bangla Video 
Post Your Comments