আমাদের মুভি না আধুনিক না পৌরাণিক : সিরাজ হায়দার

৩০০ মুভির সফল অভিনেতা সিরাজ হায়দার। স্টেজ পারফর্মার, রচনা, নির্দেশনা, মুভি পরিচালনায় রয়েছে তার খ্যাতি। তিনি একজন ফ্রিডম ফাইটার, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সংগ্রামী শিল্পী গোষ্ঠীর হয়ে সংগ্রামী চেতনায় তার ভূমিকা প্রশংসনীয়। সম্প্রতি সিরাজ হায়দার এসেছিলেন যায়যায়দিন চে-কাফেতে।

আপনার জন্ম ও শৈশব সম্পর্কে বলবেন?
আমার জন্ম বিক্রমপুরের মুন্সীগঞ্জে। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব-কৈশোর বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে। বাবার একমাত্র ছেলে ছিলাম। ছোট বেলায় খুব দুষ্টু ছিলাম। ১৪ স্কুল ঘুরে করেছি ম্যাট্রিক পাস। গ্র্যাজুয়েশন করা হয়নি।

মঞ্চে প্রথম কাজ শুরু করেছেন কখন থেকে?
১৯৬২ সালে। আমি তখন স্কুলে পড়ি। টিপু সুলতান নাটকে টিপু সুলতানের ছেলের চরিত্রে প্রথম অভিনয় করি। ১৯৬৫ সালে ওই নাটকটির করিম শাহ ভিলেইন চরিত্রে অভিনয় করি এবং বেশ প্রশংসা কুড়াই। এভাবে পাড়া, মহল্লার ক্লাব-স্কুলসহ বিভিন্ন স্টেজে কাজ করতে করতে আজ এ পর্যন্ত।

কোন দলের হয়ে স্টেজে এখন কাজ করছেন?
দীর্ঘদিন ‘রঙ্গনা’র সঙ্গে ছিলাম। ৭৫০টির মতো শো করেছি। পরে দ্রাবিড় নাট্যদল তৈরি করলাম। সেখানেও ১২৫টির বেশি শো করেছি। সামনে খুব শিগগিরই ‘আলো একটু আলো’ নাটকের একটি শো হচ্ছে। নতুন বিশ্ব বেহায়া ও ইতর আলির দেশপ্রেম নাটকের প্রস্তুতি চলছে।

মঞ্চের বেশ কিছু নাটক রচনা করেছেন এবং নির্দেশনা দিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য নাটকের কথা বলবেন?
১৯৬৭ সালে দায়ী কে নাটকের মাধ্যমে রচনা ও নির্দেশনায় আসি। আগামী দিন, আলো একটু আলো, বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নিন, বেয়াদবি মাফ করবেন, শয়তানের ব্লাড পেশার, আদম ব্যাপারী, যুগে যুগে আবদুল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য বলা যেতে পারে।

ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আসেন কখন?
মঞ্চের পাশাপাশি আমি ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রথম কাজ করি রেডিওতে। ১৯৬৮-৭৫ সাল পর্যন্ত রেডিওতে খবর পড়েছি। একই সময় টিভিতেও ইন করি। ১৯৭২ সাল থেকে রেগুলার শিল্পী হিসেবে আছি।

টিভিতে আপনার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকের কথা বলবেন?
অনেক উল্লেখযোগ্য নাটক আছে হয়তো এ মুহূর্তে সব নাম বলতে পারবো না। যেমন : স্বপ্ন বাতায়ন, দক্ষিণে জানালা, আল্লাদী, রাক্ষসী, ইডিয়ট প্রভৃতি।

মুভিতে এলেন কখন?
১৯৭২ সালে সহকারী পরিচালক হিসেবে আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে প্রথম কাজ করি ‘জল্লাদের দরবার’ মুভিতে। এরপর অঙ্গীকার, জীবন নিয়ে জুয়া প্রভৃতি মুভিতে কাজ করেছি।

ডিরেক্টর হিসেবে কোন কোন মুভি নির্মাণ করেছেন?
আমি মাত্র দুটি মুভি নির্মাণ করেছি। আদম ব্যাপারী ও সুখ।

মুভিতে অভিনয় করেন কখন থেকে?
১৯৮০ সালে প্রথম মুভিতে অভিনয় করি নারায়ণ ঘোষ মিতার সুখের সংসার মুভিতে।

মোট এ পর্যন্ত কতোগুলো মুভিতে অভিনয় করেছেন? এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনগুলো?
এ পর্যন্ত মোট ৩০০-এর উপরে মুভিতে অভিনয় করেছি। হাজার বছর ধরে খোকন সোনা, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, দাপট, শান্ত কেন মাস্তান, দলপতি, আইন আদালতসহ অনেক উল্লেখযোগ্য মুভিতে কাজ করেছি।

মুভি ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থা কেমন?
অস্থিরতা অনেকটা কেটে গেছে। বর্তমান সরকার এসে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে এসেছে। এ ব্যাপারে এমডি এবং ট্রাস্কফোর্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ শাসনগুলো কন্টিনিউ থাকলে ইন্ডাস্ট্রির চেহারা ফুল বদলে যাবে।

ইন্ডাস্ট্রির কোন কোন বিষয়ে পরিবর্তন আসলে মুভি ব্যবসায় সফলতা আসবে বলে মনে করেন?
প্রথমত ব্যক্তি নীতির পরিবর্তন আনতে হবে। পুরনো সেন্সর নীতিমালার পরিবর্তন আশাটা জরুরি। আমরা না আধুনিক না পৌরাণিক। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোনটায় থাকবো। এটা স্থির হওয়া উচিত। মুভি হলো বিনোদনের বড় মাধ্যম। এখানে পোশাকে আধুনিকতা, সুন্দর গল্প, ভালো মুভির জন্য সরকারি অনুদান বাড়ানো হলে আমার বিশ্বাস আমরা আগের ব্যবসায়ে ফিরে আসতে পারবো।

ইদানীং বেশ কয়েকটি হল ভেঙে সেখানে মার্কেট করা হচ্ছে। এতে মুভি ইন্ডাস্ট্রি কতোটা ঝুকির মধ্যে পড়বে বলে মনে করেন?
পৃথিবীর কোথাও এমন আইন নেই যে হল ভেঙে মার্কেট করবে- এটা আমাদের দেশেই সম্ভব হয়েছে আইন না থাকার কারণে। আমাদের দেশে এমনিতেই হলের সংখ্যা কম। তারপরে হল ভেঙে ফেললে দর্শক দূরে গিয়ে মুভি দেখতে অনীহা প্রকাশ করবে। এভাবে চলতে থাকলে একটি বড় ঝুকির মধ্যে পড়বে আমাদের মুভি ইন্ডাস্ট্রি।

দীর্ঘদিন ধরে টিভি মিডিয়ায় কাজ করছেন, এখানকার অভিজ্ঞতার কথা বলবেন?
আমাদের টিভি মিডিয়া কিছু লোকের হাতের মুঠোয় চলে গেছে। চেনা মুখ দেখে কাজ দেয়ার কারণে অনুষ্ঠানের মান নষ্ট হচ্ছে। স্পন্সর হস্তক্ষেপের কারণে ভালো নাটক বাদ দিয়ে যা তা নাটক এখন চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে। টক শোতে যাকে তাকে ইন্টারভিউ করছে যাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। শুধু লিয়াজোর কারণে তারা আসছে যারা দেশের জন্য কাজ করেছে তাদের দিকে তাকায়ও না। বেইলি রোডে যখন মুষ্টিমেয় কিছু লোক জীবন যৌবন দিয়ে কাজ করে আমাদের সংস্কৃতিকে দেশে একটা জায়গায় এস্টাবলিস্ট করেছে। কাদের জন্য হয়েছে তাদের নাম নেই। আমরা ওই সময় কাজ করেছি ডাল-ভাত খাওয়ার জন্য এখন কাজ করে ফ্ল্যাট কেনার জন্য। ডাল-ভাত খাওয়ার চিন্তা করে আজ যারা কাজের একটা জায়গা তৈরি করে দিয়েছে তাদের মিনিমাম একটা মূল্যায়ন নেই। যারা ভালো কাজ করেছে তাদের ভুললে চলবে না। মনে রাখতে হবে দেশটা যদি স্বাধীন না হতো আজ এতো চ্যানেল আসতো না।

শুনেছি আপনার হাতে অনেক শিল্পী তৈরি হয়েছে?
দিলদার, রাজীব, জুলিয়া, দিলারা, সাদেক বাচ্চুসহ অসংখ্য শিল্পী আমার হাতে তৈরি হয়েছে।

আপনি একজন ফ্রিডম ফাইটার। সংস্কৃতির অঙ্গনে যুদ্ধের সময় কি কি করেছেন? আপনার সঙ্গে আর কে কে ছিলেন?
সে সময় আমরা আগরতলায় ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতাম। উজ্জীবিত করতাম। বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা তুলে কাপড়-জুতা ইত্যাদি কিনে দিতাম। বাংলাদেশ সংগ্রামী শিল্পী গোষ্ঠী নামে ১৯৭১ সালে একটি দলও গঠন করেছিলাম। এখানে আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, কবরী সারোয়ার, সুভাষ দত্ত, সুবল দাস, অভিনেতা জাফর ইকবাল, নমিতা ঘোষ, সেফালী ঘোষ, শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব, বাবুল আকতার, শহিদুল ইসলাম, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, স্বপ্না রায়সহ আরো অনেকে দেশের জন্য কাজ করেছেন। রক্তাক্ত বাংলা নামে একটি গীতি নকশা আমার লেখা প্রায় জায়গায় শো হতো। মানুষ উজ্জীবিত হতো এটা দেখে।

বর্তমান ব্যস্ততা সম্পর্কে বলবেন?
সোহানুর রহমান সোহানের ভালোবাসা তোমার আমার, শাহীন সুমনের সন্তান আমার অহঙ্কার, এম এম সরকারের আত্মগোপন মুভির কাজ চলছে। এগুলো নিয়ে ব্যস্ত আছি।

ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে বলবেন?
আমার দুই ছেলে এক মেয়ে, স্ত্রী মিনা, সরকারি চাকরিজীবী।

আগামীর ভাবনা কি?
শত নারী এক পুরুষ নামে একটি মেগাসিরিয়াল নিয়ে ভাবছি। আশা করি, খুব শিগগিরই কাজ শুরু করবো, সুন্দর মুভি করে যেতে চাই।

সূত্রঃ যায়যায়দিন।

No tag for this post.

Related Bangla Video Posts:

Post Your Comments

All comments are subject to editorial review and decision.

Bangla Video : Incoming search terms

    Free Membership. Join Now!